৩৮.১০ লক্ষ আপিলের মধ্যে প্রায় ৩১ লক্ষই ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে আপত্তি—দাবি আদালতে; ৩১ বিধানসভা আসনে ভোট বাদ পড়ার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তৃণমূলের
নয়াদিল্লি/কলকাতা, ২৭ আগস্ট: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য চলা Special Intensive Revision (SIR) ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, সেই নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আপিল এবং বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে তার সম্ভাব্য প্রভাব—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দাবি উঠে এসেছে।
আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, SIR-সংক্রান্ত আপিলেট ট্রাইব্যুনালগুলিতে মোট ৩৮,১০,৬২০টি আপিল দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮২,৭৮২টি আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলির মধ্যে ৭৫,৪৪৩টি ক্ষেত্রে ভোটারদের নাম ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর ৭,৩৩৯টি ক্ষেত্রে নাম বাদই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নিষ্পত্তি হওয়া মামলার প্রায় ৯১ শতাংশে ভোটারদের পক্ষে সিদ্ধান্ত এসেছে।
তবে এই ৯১ শতাংশের হিসাবটি সমস্ত বাদ পড়া ভোটারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়—এটি শুধুমাত্র ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া ৮২,৭৮২টি আপিলের ফলাফল। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩৮ লক্ষের বেশি আপিল, বড় অংশই নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা?
সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন RTI-র তথ্য তুলে ধরে জানান, প্রায় ৩১ লক্ষ আপিল ভোটার তালিকায় কারও নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে করা হয়েছে, আর প্রায় ৭ লক্ষ আপিল করেছেন সেই ভোটাররা, যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোটার হিসেবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের আপিলকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ তাঁদের ভোটাধিকার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও জানতে চান, কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে কতজন ভোটার বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন নিজেদের বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। কারণ, কোনও আসনে জয়ের ব্যবধান যদি কম হয় এবং বাদ পড়া ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি পুনর্বহালের আবেদন করেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক বিচার করার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৩১ বিধানসভা আসন নিয়ে তৃণমূলের দাবি
ভিডিওতে যে বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটিই শুনানিতে তৃণমূলের পক্ষ থেকেও সামনে আসে।
তৃণমূলের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন, ওই আসনগুলিতে বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধান SIR-পর্বে বাদ দেওয়া ভোটারের সংখ্যার তুলনায় কম ছিল।
উদাহরণ হিসেবে AC-145-এর কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০১ ভোট, অথচ SIR-এর সময় ৮,৭৮৫ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল বলে আদালতে দাবি করা হয়। আরেকটি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান ছিল ৩১৬ ভোট, যেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি বলে জানানো হয়।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, মুর্শিদাবাদের একটি আসনে প্রার্থীর পরাজয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৫ হাজার ভোট, অথচ সেখানে প্রায় ২৭ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। তবে শুধুমাত্র বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা এবং জয়ের ব্যবধানের তুলনা থেকেই নির্বাচনের ফলাফল SIR-এর কারণে পরিবর্তিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কোন ভোটার বাস্তবে ভোট দিতে পারতেন, তাঁদের মধ্যে কতজন আপিল করেছেন এবং সেই আপিলের ফল কী হয়েছে—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
“নতুন করে নির্বাচন করা যায়?”—সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন
৩১টি আসনের ফলাফল নিয়ে এই যুক্তি শোনার পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত প্রশ্ন তোলেন—এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদালত কি নতুন করে নির্বাচন করার নির্দেশ দিতে পারে?
একই সঙ্গে আদালত জানতে চায়, ওই ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন-সংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়েছে কি না। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সব আসনে নয়, কয়েকটি আসনে এ ধরনের মামলা রয়েছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা শুধুমাত্র ওই ৩১টি আসনের মধ্যে নিজেদের তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখবে না। বরং SIR-সংক্রান্ত সমস্ত বকেয়া আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টি আদালত বিবেচনা করবে।
নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাইল আদালত
সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে একটি বিস্তারিত হলফনামা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে—
বর্তমানে কতগুলি আপিল ট্রাইব্যুনালে pending রয়েছে;
কতগুলি আপিল বাদ পড়া ভোটাররা করেছেন;
কতগুলি আপিল ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে করা হয়েছে;
কতগুলি মামলা ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে;
কতগুলি মামলায় আবেদনকারীর পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়েছে;
নাম পুনর্বহালের নির্দেশের পর ভোটার তালিকা কীভাবে সংশোধন করা হয়েছে;
দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন রয়েছে কি না।
আদালত দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
৯১ শতাংশের তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৮২,৭৮২টি আপিলের মধ্যে ৭৫,৪৪৩ জনের নাম ফের যুক্ত হওয়া SIR প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলির বিপুল সংখ্যকেই ভোটারদের নাম পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। “SIR-এ বাদ পড়া ৯১ শতাংশ ভোটারের নাম ফিরেছে”—এমন দাবি সঠিক নয়। ৯১ শতাংশ হলো শুধুমাত্র যে ৮২,৭৮২টি আপিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার মধ্যে নাম পুনর্বহালের হার। বিপুল সংখ্যক আপিল এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী দলগুলি SIR প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ভিডিওতে কংগ্রেসের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টও দেখানো হয়েছে, যেখানে SIR-এর মাধ্যমে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং পরে আপিলের মাধ্যমে নাম পুনরায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে রাজনৈতিক অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই ধরনের রাজনৈতিক অভিযোগকে সরাসরি নির্বাচনী কারচুপির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। SIR-এর মাধ্যমে কোনও ভোটারের নাম বাদ পড়ার কারণ, সেই ভোটার ভোট দিতে চেয়েছিলেন কি না, আপিল করেছিলেন কি না এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর নাম পুনর্বহাল হয়েছে কি না—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সামনে কী?
এখন মূল নজর সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের জমা দেওয়া বিস্তারিত তথ্যের দিকে। বিশেষ করে ৩৮.১০ লক্ষ আপিলের প্রকৃতি, ৭৫,৪৪৩টি নাম পুনর্বহালের কারণ এবং ৩১টি বিতর্কিত বিধানসভা কেন্দ্রে বাদ পড়া ভোটারদের কতজন আপিল করেছেন—এই তথ্যগুলি মামলার পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বকেয়া আপিল দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। ভবিষ্যতের নির্বাচন, বিশেষ করে লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে সমস্ত প্রাসঙ্গিক আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি করার প্রয়োজনীয়তার কথাও আদালত বলেছে।
সুতরাং, পশ্চিমবঙ্গের SIR বিতর্ক এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক বিষয় নয়—এটি ভোটাধিকার, নির্বাচনী ফলাফলের প্রভাব এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে একটি বড় আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তবে SIR-এর কারণে কোনও নির্দিষ্ট নির্বাচনের ফলাফল বদলে গেছে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়তে চলা বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির নিষ্পত্তির দিকে নজর রাখা জরুরি।

উদ্ধারকারী দল পাঠাতে চেয়েছিল ভারত চিন আমেরিকা, কিন্তু বিদেশি সাহায্য নিতে নারাজ নেপাল, কেন?

পশ্চিমবঙ্গের SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে তীব্র প্রশ্ন, ৮২,৭৮২ আপিলের মধ্যে ৯১% ক্ষেত্রেই ফিরেছে ভোটারদের নাম

কাঁচরাপাড়ায় অটো রুটে দুর্নীতির অভিযোগ, কাউন্সিলরদের নামে গাড়ি নিয়ে উঠল প্রশ্ন

“মমতাই সর্বোচ্চ নেত্রী, চিঠি সইয়ের আগে কিছুই জানানো হয়নি”—বিস্ফোরক দাবি ঋতব্রত শিবিরের বিধায়কদের

সরকারের অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যমে মুখ খুললে চাকরিতে কোপ, নয়া নির্দেশিকা নবান্নের

ভাটপাড়া পুরসভায় গণইস্তফার হিড়িক, পদ ছাড়লেন ২৯ জন কাউন্সিলার

দিল্লিতে টানা ৩ দিনের অটো-ট্যাক্সি ধর্মঘট, চরম ভোগান্তিতে নিত্যযাত্রীরা

হালিশহর পুরসভাতে বড়সড় ভাঙন, একযোগে ইস্তফা ১৬ কাউন্সিলরের

“পালাবদলে তৃণমূলে ধস, কাঁচরাপাড়া পুরবোর্ডে ভাঙন, একসঙ্গে ইস্তফা ১৫ কাউন্সিলরের”

রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে লাগু হল CAA, অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্য ছাড়া করার প্রক্রিয়া শুরু