বাংলার রাজনৈতিক অন্দরে ফের চাঞ্চল্য। দুর্নীতির অভিযোগে শেষমেশ পুলিশের হাতে আটক হলেন বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলর তথা এমআইসি দেবরাজ চক্রবর্তী। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং উত্তর ২৪ পরগনার যুব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনাচক্রে রাজনৈতিক মহলে আরও বেশি করে জল্পনা বাড়িয়েছে একটি বিশেষ সমাপতন। যেদিন ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেন, ঠিক সেই দিনই পুলিশের জালে ধরা পড়লেন দেবরাজ। ফলে শাসকদলের অভ্যন্তরে চাপা অস্বস্তি যে দ্রুত বাড়ছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় রাখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই কার্যত বেপাত্তা ছিলেন দেবরাজ চক্রবর্তী। ৪ মে-র পর থেকে তাঁর কোনও প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি তো দূরের কথা, ঘনিষ্ঠ মহলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে সূত্রের দাবি। প্রশাসনিক মহলে তখন থেকেই জোর গুঞ্জন ছিল—সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ এড়াতেই আত্মগোপনে গিয়েছেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ তাঁর সাময়িক আশ্রয়ে হানা দেয়। সেখান থেকেই তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও সরকারি ভাবে এখনও গ্রেফতার বা আটকের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি পুলিশ।
দেবরাজ শুধু বিধাননগরের এক কাউন্সিলর ছিলেন না। কামারহাটি থেকে বিধাননগর পর্যন্ত বিস্তৃত যুব তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোয় তাঁর প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। দলের অন্দরে তাঁকে অনেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডান হাত’ হিসেবেই দেখতেন। ক্যামাক স্ট্রিটের রাজনৈতিক গুডবুকে জায়গা করে নেওয়ার সুবাদে তাঁর ক্ষমতা ও দাপট নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার সাহস খুব কম নেতারই ছিল।
তবে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত চলাকালীনই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে এসেছিলেন দেবরাজ। এবার অভিযোগ উঠেছে, বিধাননগর পুর এলাকায় নিয়োগ, টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া এবং আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে একাধিক অনিয়মের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে। সূত্রের খবর, নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে বিস্তারিত ডসিয়ার তৈরি করছিল পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ।
অভিযোগ, গ্রেফতারি এড়াতে গত কয়েকদিন ধরে নিজের সমস্ত মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছিলেন দেবরাজ। এমনকি ঘনিষ্ঠ মহলের অনেকেই তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানতেন না। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। একদিকে কালীঘাট ও হরিশ মুখার্জি রোড ঘিরে পুরসভার নোটিশ, অন্যদিকে ফলতায় জাহাঙ্গির খানের সরে দাঁড়ানো—তার ঠিক পরেই দেবরাজের আটক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সমস্ত ঘটনাই তৃণমূলের দ্বিতীয় সারির শক্তিকেন্দ্রকে ঘিরে প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করছে।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত দুর্বল করার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি। দেবরাজ চক্রবর্তীর এই আটক পর্ব ভবিষ্যতে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক পদক্ষেপের পূর্বাভাস কিনা, এখন সেদিকেই নজর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের।