ক্যানসারকে হারিয়ে ৪৮৭ নম্বর, নিমতার মেয়ের লড়াই আজ বাংলার অনুপ্রেরণা
ক্যানসার মানেই যেন জীবনের সমস্ত রং হঠাৎ মুছে যাওয়া। বিশেষ করে সেই মারণরোগ যখন থাবা বসায় এক কিশোরীর শরীরে, তখন স্বপ্নগুলোও অনেক সময় হাসপাতালের সাদা দেওয়ালে আটকে পড়ে। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনার নিমতার মেয়ে অদ্রিজা গণ দেখিয়ে দিলেন, ইচ্ছাশক্তি আর লড়াই করার মানসিকতা থাকলে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধও জেতা যায়।
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিকে ৫০০-র মধ্যে ৪৮৭ নম্বর পেয়ে রাজ্যের মেধাতালিকায় দশম স্থান অর্জন করেছেন অদ্রিজা। অথচ এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে এক দীর্ঘ, যন্ত্রণাভরা অধ্যায়—৮২টি কেমোথেরাপি, অসংখ্য হাসপাতালের দিনরাত আর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার লড়াই।
অদ্রিজার অসুস্থতা ধরা পড়ে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে ‘টি-সেল লিম্ফোমা’, এক জটিল ধরনের ব্লাড ক্যানসার। যে বয়সে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলাধুলা আর স্কুলের ব্যস্ততায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই তাঁর জীবন ঘিরে ফেলে হাসপাতাল, ওষুধ আর কেমোথেরাপির দীর্ঘ যন্ত্রণা।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, চিকিৎসার সময় তাঁকে ৮২টি কেমোথেরাপি এবং ১৮টি মেরুদণ্ডের ইনজেকশন নিতে হয়েছিল। প্রতিটি কেমোর পর অসহ্য শারীরিক কষ্ট সহ্য করেও হার মানেননি অদ্রিজা। বরং প্রতিবারই আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন।
এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে ছায়ার মতো থেকেছেন বাবা-মা। বাবা জয়মঙ্গল গণ পেশায় শিক্ষক। মা জ্যোতি গণও শিক্ষিকা। মেয়ের চিকিৎসার জন্য মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন তাঁরা। পরিবার ভেঙে না পড়ে বরং আরও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল অদ্রিজার পাশে।
দীর্ঘ চার বছরের চিকিৎসার পর ২০২১ সালের জুন মাসে চিকিৎসকেরা তাঁকে ক্যানসারমুক্ত ঘোষণা করেন। কিন্তু তাতেই লড়াই শেষ হয়নি। আবার নতুন করে পড়াশোনার মূল স্রোতে ফেরা, স্কুলের ছন্দে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া—সবটাই ছিল আর এক যুদ্ধ।
রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুলের ছাত্রী অদ্রিজা ধীরে ধীরে ফিরে পান নিজের আত্মবিশ্বাস। উচ্চমাধ্যমিকে তাঁর বিষয় ছিল ভূগোল, অর্থনীতি, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন এবং মনোবিদ্যা। অসুস্থতার কারণে কখনও রাত জেগে পড়তে পারেননি। কিন্তু যতটুকু সময় পেয়েছেন, সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
অদ্রিজা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র বই নয়, গান শোনা, গল্প পড়া এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোও তাঁকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। সেই জোরেই আজ তিনি রাজ্যের সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না অদ্রিজা। ভবিষ্যতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করতে চান তিনি। ক্যানসারের চিকিৎসার সময় কাছ থেকে দেখেছেন মানুষের মানসিক ভাঙন। তাই একজন মনোবিদ হয়ে ভবিষ্যতে অবসাদ ও মারণরোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতেই চান তিনি।
নিমতার এই কিশোরীর সাফল্য আজ শুধু একটি ফলাফল নয়, এটি অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক। ৪৮৭ নম্বরের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য যন্ত্রণার রাত, চোখের জল আর হার না মানা জেদ। অদ্রিজা গণ তাই আজ শুধু একজন মেধাবী ছাত্রী নন, বাংলার অসংখ্য মানুষের কাছে তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।