দেশজুড়ে পেট্রল-ডিজেলের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই এবার আন্দোলনের আগুন জ্বলে উঠল রাজধানী দিল্লিতে। সিএনজি-র দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হল তিন দিনের পরিবহণ ধর্মঘট। আগামী ২৩ মে পর্যন্ত চলবে এই কর্মসূচি। ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ‘অল ইন্ডিয়া মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেস’ (AIMTC)। তাদের সঙ্গে সামিল হয়েছে প্রায় ৬৮টি ছোট-বড় পরিবহণ সংগঠন। ট্রাক, প্রাইভেট বাস, ট্যাক্সি থেকে শুরু করে একাংশ অটোচালকরাও নেমেছেন আন্দোলনে।
ধর্মঘটের জেরে সকাল থেকেই কার্যত স্তব্ধ রাজধানীর পরিবহণ ব্যবস্থা। রেলস্টেশন, বিমানবন্দর কিংবা অফিসপাড়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। বহু জায়গায় অ্যাপ-ক্যাবের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কম গাড়ির সুযোগে বাড়তি ভাড়া বা ‘সার্জ প্রাইসিং’-এর অভিযোগও উঠেছে ওলা, উবার ও র্যাপিডোর বিরুদ্ধে।
কেন এই ধর্মঘট?
আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগ, দিল্লি সরকার পরিবেশ রক্ষার নামে মালবাহী গাড়ির উপর অতিরিক্ত ‘এনভায়রনমেন্ট কমপেনসেশন সেস’ চাপিয়েছে। পরিবহণ সংগঠনগুলির দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল—যে সব গাড়ি দিল্লিকে শুধু ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের ক্ষেত্রেই এই কর প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে দিল্লিতে প্রবেশ করা প্রায় সব মালবাহী গাড়ির উপরই এই সেস বসানো হয়েছে।
এছাড়াও আগামী ১ নভেম্বর থেকে দিল্লির বাইরে রেজিস্টার্ড BS-IV বাণিজ্যিক গাড়ির রাজধানীতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করছেন চালকেরা। তাঁদের বক্তব্য, এই নিয়ম কার্যকর হলে হাজার হাজার চালকের রুজি-রুটিতে টান পড়বে।
অ্যাপ-ক্যাব সংস্থার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ
চালকদের একাংশের অভিযোগ, ওলা, উবার ও র্যাপিডোর মতো সংস্থাগুলি চালকদের উপার্জন ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কিলোমিটার-পিছু আয় ও ইনসেনটিভ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ জ্বালানির দাম, বিমা, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ লাগাতার বেড়েই চলেছে।
‘চালক শক্তি ইউনিয়ন’-এর সহ-সভাপতি অনুজ কুমার রাঠোর জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে দিল্লিতে ট্যাক্সি ভাড়া বাড়েনি। সরকারের কাছে দ্রুত নতুন ভাড়ার কাঠামো ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তিনি। হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী এক-দু’সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হলে আরও বড় আন্দোলনে নামবেন চালকেরা।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
ধর্মঘটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিত্যযাত্রীদের উপর। নতুন দিল্লি, পুরনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশনের বাইরে বহু যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গিয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও একই ছবি। অনেক অটো ও ট্যাক্সি রাস্তায় না নামায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বৃহত্তম পণ্য পরিবহণ কেন্দ্র ‘সঞ্জয় গান্ধী ট্রান্সপোর্ট নগর’-এ সকাল থেকেই কার্যত কাজ বন্ধ। সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রাক।
অটোচালকদের মধ্যে বিভাজন
যদিও সব অটো ইউনিয়ন এই ধর্মঘটে সামিল হয়নি। ‘অটো রিকশ সঙ্ঘ’-এর সাধারণ সম্পাদক রাজেন্দ্র সোনির দাবি, এই সমস্যা মূলত ট্রাক ও মালবাহী গাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তাঁদের সংগঠনের অটো ও ট্যাক্সি পরিষেবা চালু থাকবে। তবুও রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম থাকায় রাজধানীর বহু অংশে জনজীবন ব্যাহত হয়েছে।
জ্বালানির আগুনে বাড়ছে চাপ
এই ধর্মঘটের আবহেই এক সপ্তাহের মধ্যে দু’দফা বেড়েছে পেট্রল ও ডিজেলের দাম। শেষবার লিটার-পিছু ৯০ পয়সা বৃদ্ধি হয়েছে। বর্তমানে দিল্লিতে পেট্রলের দাম লিটার প্রতি ৯৮.৬৪ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯১.৫৮ টাকা। কলকাতায় পেট্রলের দাম পৌঁছেছে ১০৯.৭০ টাকায়, যা দেশের বড় শহরগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে চেন্নাইয়ে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৯৬.১১ টাকা।
তেলের আগুনে যখন নাজেহাল সাধারণ মানুষ, তখন নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে রাস্তায় নেমেছেন চালকেরা। এই অচলাবস্থা কাটাতে সরকার কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজধানী।