চিন-আমেরিকা ছাড়া সবাই পিছনে! ২০৪৭-এ ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির চূড়ায় ভারত - Bangla Hunt

চিন-আমেরিকা ছাড়া সবাই পিছনে! ২০৪৭-এ ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির চূড়ায় ভারত

By Bangla Hunt Desk - January 09, 2026

নয়াদিল্লি: এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংঘাত। অন্য দিকে চিনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ঘাটতি। তার উপর ঘরোয়া উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়ের বৈষম্য— সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জের তালিকা ছোট নয়। তবু সেই সব বাধা পেরিয়েই বিশ্বের অর্থনৈতিক দৌড়ে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে ভারত। নতুন বছরের শুরুতেই সেই ছবিই তুলে ধরল আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সংস্থা ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’ (EY)।

তাদের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, স্বাধীনতার ১০০ বছরে— অর্থাৎ ২০৪৭-’৪৮ অর্থবর্ষে— ভারতের অর্থনীতির আকার পৌঁছোতে পারে ২৬ লক্ষ কোটি ডলারে। গড়ে বছরে ছ’শতাংশ হারে আর্থিক বৃদ্ধি বজায় রাখতে পারলেই সেই ঐতিহাসিক সাফল্য সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, মাথাপিছু গড় আয় বেড়ে একলাফে ১৫ হাজার ডলার বা তারও বেশি হতে পারে, যা বর্তমানের প্রায় ছ’গুণ।

EY-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যেই চিন ও আমেরিকার পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে ভারত। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে খুব শিগগিরই জার্মানিকেও ছাপিয়ে যেতে পারে নয়াদিল্লি। চলতি আর্থিক বছরের শেষে (২০২৫-’২৬) ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি পৌঁছোতে পারে ৪.১ থেকে ৪.৩ লক্ষ কোটি ডলারে— যা গত দশ বছরে প্রায় দ্বিগুণ। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ২০১৫ সালে ভারতের জিডিপি ছিল মাত্র ২.১ লক্ষ কোটি ডলার।

ভারতীয় অর্থনীতির এই উত্থান নিয়ে আশাবাদী আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার (IMF)-ও। তাদের মতে, নানা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশের নীচে নামার সম্ভাবনা কম। গত বছরই জাপানকে ছাপিয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েছে ভারত। আইএমএফের অনুমান, ২০২৮ সালের মধ্যেই পিছিয়ে পড়তে পারে জার্মানি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক শুল্কনীতি’ ভারতের রফতানির উপর চাপ সৃষ্টি করলেও, অর্থনীতিতে তার বড় কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বলেই দাবি কেন্দ্রের। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২ শতাংশ— যা অধিকাংশ আর্থিক সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের শক্তির মূল উৎস তার বিপুল অভ্যন্তরীণ বাজার। জনসংখ্যার জোরে চাহিদা তৈরি হচ্ছে ভোগ্যপণ্য ও পরিষেবা খাতে। সরকারি তথ্য বলছে, ব্যক্তিগত চূড়ান্ত খরচ (PFCE) বেড়েছে প্রায় ৭.৯ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের অধিকাংশ পরিবারই এখন খরচ করার মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করেছে।

উৎপাদন ও নির্মাণ খাতেও রেকর্ড গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই দুই খাতে বৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৯.১ ও ৮.১ শতাংশ। ফলে বাড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান। পাশাপাশি, পরিষেবা খাত তো বরাবরই ভারতের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সেখানে বৃদ্ধির হার ৯ শতাংশেরও বেশি। তথ্যপ্রযুক্তি ও রিয়্যাল এস্টেটের মতো পেশাদার পরিষেবায় বৃদ্ধি ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাপী পরিষেবা রফতানিতেও শক্ত অবস্থান গড়েছে ভারত। বর্তমানে দেশে রয়েছে প্রায় ১,৫০০ গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার— যা গোটা বিশ্বের মোট সংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ। মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২০ কোটি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ৮৩.৭ কোটি— ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত যে কতটা শক্ত, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে এখানেই।

পরিকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিয়েছে কেন্দ্র। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের বাজেটে ১১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে হাইওয়ে, রেল, বন্দর ও নগর উন্নয়নে। পাশাপাশি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ও পিএলআই স্কিমের মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত উৎপাদন ক্ষেত্রকে চাঙ্গা করেছে।

তবে সব কিছু যে মসৃণ, তা নয়। বেকারত্ব, আয়-বৈষম্য, ভূ-রাজনৈতিক অশান্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। মোট আয়ের বড় অংশ মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত— এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

তবু সামগ্রিক ছবি আশাব্যঞ্জক। সব বাধা পেরিয়ে চিন ও আমেরিকার পর বিশ্বের অর্থনৈতিক মঞ্চে নিজের জায়গা পোক্ত করছে ভারত— এমনই বার্তা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সংস্থাগুলির রিপোর্ট। স্বাধীনতার শতবর্ষে ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন যে আর কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নয়, তা-ই স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে ধীরে।

সব খবর পড়তে আমাদের WhatsApp গ্রুপে যুক্ত হোনএখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


প্রাসঙ্গিক খবর