প্রতিদিন ২৩টি পারমাণবিক বোমার সমান তাপ! উটাহর মরুভূমিতে তৈরি হচ্ছে দৈত্যাকার এআই শহর - Bangla Hunt

প্রতিদিন ২৩টি পারমাণবিক বোমার সমান তাপ! উটাহর মরুভূমিতে তৈরি হচ্ছে দৈত্যাকার এআই শহর

By Bangla Hunt Desk - May 19, 2026

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহের নির্জন মরুভূমি অঞ্চল হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও পরিবেশ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কারণ সেখানে গড়ে উঠতে চলেছে এমন এক বিশাল এআই ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস, যার সম্ভাব্য তাপ উৎপাদন নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে চর্চা শুরু হয়েছে। “স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট” নামে পরিচিত এই প্রকল্পকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ফেলেছে একটি দাবি— পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হলে এই ডেটা সেন্টার প্রতিদিন এমন পরিমাণ তাপ ছড়াতে পারে, যা “২৩টি হিরোশিমা পারমাণবিক বোমা”-র শক্তির সমতুল্য।

শুনতে আতঙ্কজনক হলেও, বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন— এখানে কোনও পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা তেজস্ক্রিয়তার প্রশ্ন নেই। “পারমাণবিক বোমা” তুলনাটি ব্যবহার করা হয়েছে শুধুমাত্র শক্তির পরিমাণ বোঝানোর জন্য। বাস্তবে এটি একটি বিশাল শিল্প-পর্যায়ের তাপ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়, যা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ভবিষ্যৎ চিত্র সামনে এনে দিয়েছে।

উটাহের বক্স এল্ডার কাউন্টি ও হ্যানসেল ভ্যালি অঞ্চলে তৈরি হতে চলা এই প্রকল্পের আয়তন প্রায় ৪০ হাজার একর পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, এর বিস্তার নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটনের থেকেও বড় হতে পারে। কোথাও আবার একে প্রায় ২০০০ ওয়ালমার্ট সুপারসেন্টারের সমান বলে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি আর পাঁচটা সাধারণ ডেটা সেন্টার নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্পনগরী।

বর্তমানে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির বিস্ফোরক বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার শিল্প নতুন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আগে সার্ভার মূলত ওয়েবসাইট, ভিডিও স্ট্রিমিং বা ক্লাউড স্টোরেজ পরিষেবার জন্য ব্যবহৃত হলেও এখন ChatGPT, Gemini, Claude বা Midjourney-এর মতো এআই মডেল চালাতে হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন GPU প্রয়োজন হচ্ছে। এই GPU ক্লাস্টারগুলিকে দিনের পর দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে বিপুল বিদ্যুতের দরকার হয়।

স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল তার সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদা। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, এই ক্যাম্পাস পূর্ণ মাত্রায় চালু হলে প্রায় ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। তুলনায়, উটাহ রাজ্যের বর্তমান সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদাই প্রায় ৪ থেকে ৫ গিগাওয়াট। অর্থাৎ একটি মাত্র এআই ক্যাম্পাস গোটা রাজ্যের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহারের থেকেও বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে।

এআই ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ খরচ নয়, বরং উৎপন্ন হওয়া বিপুল তাপ। হাজার হাজার GPU ও সার্ভার একসঙ্গে কাজ করার ফলে অবিরাম তাপ তৈরি হয়। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে বিশাল কুলিং টাওয়ার, তরল শীতলীকরণ পাইপলাইন এবং শিল্পস্তরের বায়ু নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্যই মোট বিদ্যুতের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হয়ে যেতে পারে।

এই তাপ নিয়েই আলোচনায় আসেন উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ডক্টর রব ডেভিস। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, পুরো ডেটা সেন্টার চালু হলে মোট তাপশক্তি নির্গমন প্রায় ১৬ গিগাওয়াট সমতুল্য হতে পারে। সেই শক্তিকে তুলনা করতে গিয়েই তিনি বলেন, প্রতিদিনের বর্জ্য তাপ “২৩টি হিরোশিমা বোমা”-র শক্তির সমান হতে পারে। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় ব্যাপক বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক।

তবে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই তুলনার অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা। হিরোশিমার বোমা কয়েক সেকেন্ডে বিপুল শক্তি মুক্তি দিয়েছিল। অন্যদিকে ডেটা সেন্টার ধীরে ধীরে ২৪ ঘণ্টা ধরে তাপ উৎপন্ন করে। এখানে কোনও বিস্ফোরণ নেই, তেজস্ক্রিয়তা নেই, শকওয়েভ নেই। তবুও “পারমাণবিক বোমা” শব্দবন্ধ সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি করায় বিতর্ক আরও বেড়েছে।

এদিকে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ অন্য জায়গায়। হ্যানসেল ভ্যালি একটি বোল-আকৃতির মরুভূমি অববাহিকা অঞ্চল। এই ধরনের এলাকায় তাপ সহজে বেরোতে পারে না। ফলে সারাক্ষণ বিপুল তাপ নির্গমন হলে স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একে বলা হচ্ছে “নাইট-টাইম ওয়ার্মিং এফেক্ট”।

শুধু তাপ নয়, জল ব্যবহারের প্রশ্নেও বিতর্ক তীব্র হয়েছে। বৃহৎ ডেটা সেন্টারগুলিতে সাধারণত জলভিত্তিক কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার জলের প্রয়োজন হতে পারে। যদিও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা সাধারণ পানীয় জল নয়, নোনতা ভূগর্ভস্থ জল ও বিকল্প কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। কিন্তু পরিবেশবিদদের একাংশ বলছেন, মরুভূমি অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জলস্তর অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।

এই প্রকল্প ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— এআই শিল্পের জন্য ভবিষ্যতে কি আলাদা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে হবে? কারণ সৌর বা বায়ুশক্তির মতো নবীকরণযোগ্য শক্তি সবসময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারে না। অথচ এআই ডেটা সেন্টারকে ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। সেই কারণেই আবার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে এআই শিল্প বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি করতে পারে। শুধু প্রযুক্তি সংস্থাই নয়, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দ্রুত এআই নির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ও আকার— দুটোই আগামী দিনে বহুগুণ বাড়বে।

স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট তাই শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়। এটি ভবিষ্যতের সেই পৃথিবীর প্রতীক, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির সঙ্গে সমান গুরুত্ব পাবে বিদ্যুৎ, জল, পরিবেশ এবং জলবায়ুর প্রশ্নও।

সব খবর পড়তে আমাদের WhatsApp গ্রুপে যুক্ত হোনএখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


প্রাসঙ্গিক খবর