পেটের দায়ে গুজরাটে সাফাই কর্মীর কাজ, তবুও উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম হয়েছে সাগর! - Bangla Hunt

পেটের দায়ে গুজরাটে সাফাই কর্মীর কাজ, তবুও উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম হয়েছে সাগর!

By Bangla Hunt Desk - May 16, 2026

উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকায় নবম স্থান। মোট নম্বর ৪৮৮। ইংরেজি ও অর্থনীতিতে ৯৯ করে নম্বর। সাধারণত এমন ফল প্রকাশের দিন কোনও বাড়িতে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। আত্মীয়দের ফোন, পাড়ার অভিনন্দন, মিষ্টির বাক্স— সব মিলিয়ে আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের কালনার সাগর মণ্ডলের জীবনে সেই ছবিটা ছিল একেবারেই অন্যরকম।

ফল প্রকাশের দিন সে নিজের বাড়িতে ছিল না। ছিল প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দূরে গুজরাটের আমেদাবাদে। হাতে বই নয়, ছিল কাজের দায়িত্ব। কারণ সংসারের বাস্তবতা তাকে অনেক আগেই শিখিয়ে দিয়েছে— শুধু পড়াশোনা নয়, রোজগারের লড়াইটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী সাগর। মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও সে পেয়েছিল ৬৪৬ নম্বর। কিন্তু ভালো ফলাফল সবসময় জীবনকে সহজ করে দেয় না। তার বাবা-মা দু’জনেই গুজরাটে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে সাফাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা। সংসারের আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে, ছেলেকে নিশ্চিন্তে বাড়িতে বসিয়ে শুধুই পড়াশোনা করানো যাবে। তাই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হতেই সাগরও পাড়ি দেয় গুজরাটে।

আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজ শুরু করে সে। সাফাই থেকে শুরু করে নানা ছোটখাটো দায়িত্ব সামলাত প্রতিদিন। প্রথম মাসে তার বেতন ছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা। পরে সেই বেতন ১৫ হাজার টাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। সেই অর্থই ছিল তার ভবিষ্যতের স্বপ্নের প্রথম ভিত্তি।

কারণ সাগরের স্বপ্ন শুধুই চাকরি করা নয়। সে চায় UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে। ভবিষ্যতে IAS অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। আর সেই স্বপ্নের কোচিংয়ের খরচ জোগাড় করতেই এত অল্প বয়সে বাড়ি ছেড়ে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যেতে হয়েছে তাকে।

ফল প্রকাশের দিন যখন জানতে পারে যে সে রাজ্যের প্রথম দশে জায়গা করে নিয়েছে, তখন আবেগ সামলাতে পারেনি সাগর। কয়েকদিন আগেও যে ছেলেটা হোটেলের কাজে ব্যস্ত ছিল, সেই ছেলেই হঠাৎ হয়ে উঠল গোটা বাংলার গর্ব।

তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক কঠিন সামাজিক বাস্তবতা। বাংলার বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী এখনও অর্থের অভাবে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে বাধ্য হয়। কেউ ইটভাটায়, কেউ কারখানায়, কেউ আবার ভিনরাজ্যের হোটেলে। সাগরের গল্প যেন সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

তবু সবচেয়ে বড় কথা, অভাব তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। সাগর জানিয়েছে, ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাবে সে। কারণ তার কাছে শিক্ষা শুধুমাত্র নম্বর নয়, জীবনের পথ বদলে দেওয়ার একমাত্র হাতিয়ার।

আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় সাফল্যের গল্প খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু সাগর মণ্ডলের গল্প মানুষকে অন্যভাবে নাড়া দেয়। এখানে নেই কোনও বিলাসিতা, নেই বড় কোচিং সেন্টারের চাকচিক্য। আছে শুধু এক সাধারণ পরিবারের অসাধারণ লড়াই।

সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও যে ছেলে রাজ্যের মেধাতালিকায় জায়গা করে নিতে পারে, তার সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এটা সেই সব ছাত্রছাত্রীদের জন্যও এক বড় অনুপ্রেরণা, যারা প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও স্বপ্ন দেখতে ছাড়ে না।

সাগরের গল্প তাই শুধু একজন মেধাবী ছাত্রের সাফল্যের কাহিনি নয়। এটা সেই ভারতবর্ষের গল্প, যেখানে অনেক সময় স্বপ্ন দেখার আগেই পেটের দায় মানুষকে বড় করে দেয়।

সব খবর পড়তে আমাদের WhatsApp গ্রুপে যুক্ত হোনএখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


প্রাসঙ্গিক খবর