Bangla Hunt Digital

উদ্ধারকারী দল পাঠাতে চেয়েছিল ভারত চিন আমেরিকা, কিন্তু বিদেশি সাহায্য নিতে নারাজ নেপাল, কেন?

উদ্ধারকারী দল পাঠাতে চেয়েছিল ভারত চিন আমেরিকা, কিন্তু বিদেশি সাহায্য নিতে নারাজ নেপাল, কেন?

কাঠমান্ডু: ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল। শয়ে শয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ। বিপর্যয়ের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভারত, চিন, আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ-সহ একাধিক দেশ নেপালে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রস্তাব আপাতত গ্রহণ করেনি কাঠমান্ডু।

তবে বিদেশি সাহায্যের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি নেপাল। প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণসামগ্রী, অর্থ, চিকিৎসা সহায়তা, বিশেষজ্ঞ দল এবং উদ্ধার সরঞ্জাম গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের এই সিদ্ধান্তের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা।

কেন বিদেশি উদ্ধারকারী দল নয়?

নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের এক আধিকারিকের দাবি, দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলিই বর্তমানে উদ্ধারকাজ সামলানোর মতো সক্ষম। তাই বিদেশি উদ্ধারকারী দল সরাসরি মাঠে নামানোর পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সহায়তা নেওয়ার নীতি নিয়েছে কাঠমান্ডু।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক উদ্ধারকারী দল, সামরিক বিমান ও ত্রাণ সংস্থা নেপালে পৌঁছেছিল। এতে উদ্ধারকাজে গতি এলেও প্রশাসনের সামনে তৈরি হয়েছিল একাধিক নতুন চ্যালেঞ্জ।

একাধিক বিদেশি দলের মধ্যে সমন্বয় করা, তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা এবং কাজের পরিধি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার উপর ভূমিকম্পে বিমানবন্দর, রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দলকে আলাদাভাবে পরিচালনা করতে গিয়ে নেপালি প্রশাসনের উপর বেড়েছিল অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও লজিস্টিক চাপ।

এবার সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতেই একটি স্পষ্ট নেপাল-নেতৃত্বাধীন উদ্ধারব্যবস্থা বজায় রাখতে চাইছে কাঠমান্ডু।

এনডিআরএফ পাঠাতে চেয়েছে ভারত

নেপালের এই দুর্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ভারতও। নয়াদিল্লি সরাসরি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ-এর সদস্য এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

শুক্রবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নেপালের সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে নয়াদিল্লি। তবে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও ভারতের অন্যান্য সহায়তা গ্রহণ করেছে নেপাল।

ভারতের পক্ষ থেকে নেপালে পাঠানো হয়েছে ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ, অস্থায়ী আশ্রয়ের সরঞ্জাম, কম্বল, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী, সৌর আলো ও খাবার। নেপালের অনুরোধে বেইলি সেতুও পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকে থাকা প্রায় ১০০ জনকে উদ্ধারের জন্য বিশেষ সুড়ঙ্গ-উদ্ধারকারী দল এবং চিকিৎসক দল পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।

বিদেশি সাহায্যে ‘এক দরজা’ নীতি

বিদেশি সাহায্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি নেপাল। বরং আর্থিক সাহায্য গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে বিদেশি আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করা হচ্ছে।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে আসা সাহায্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সংগ্রহ করে প্রয়োজন অনুযায়ী তা বণ্টন করা। একই ধরনের সাহায্য একাধিক সংস্থা একই এলাকায় পাঠিয়ে যাতে অপচয় না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে চাইছে কাঠমান্ডু।

আমেরিকা, ব্রিটেন ও বিশ্বব্যাঙ্ক ইতিমধ্যেই নেপালকে সাহায্যের কথা জানিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কও জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি বিপর্যয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।

নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

বন্যায় বহু বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে থাকায় তাদের উদ্ধারে আলাদা ব্যবস্থা নিয়েছে নেপালের বিদেশ মন্ত্রক। বিদেশি নাগরিকদের খোঁজে একটি জরুরি প্রতিক্রিয়া দল তৈরি করা হয়েছে।

নেপালের পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪টি দেশের ৬৬৮ জন পর্যটকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ভারতের হিসাব অনুযায়ী, নেপালে প্রায় ২৯০ জন ভারতীয় নাগরিকও নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন।

এই জরুরি প্রতিক্রিয়া দলের কাজ হবে বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধারের সমন্বয় করা, নিখোঁজদের তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা। রসুয়ার তিমুরে এলাকায় চলা উদ্ধার অভিযানের সঙ্গেও একজন আধিকারিককে পাঠানো হয়েছে।

২০১৫-র ‘অপারেশন মৈত্রী’র অভিজ্ঞতা

নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভারত ‘অপারেশন মৈত্রী’র মাধ্যমে নেপালে বড় ধরনের উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চালিয়েছিল।

সেই সময় ভারত নেপালে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশিক্ষিত কুকুর, বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠিয়েছিল। বিপুল পরিমাণ ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তাও পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে নেপাল বুঝেছিল, বড় ধরনের দুর্যোগে বিপুল সংখ্যক বিদেশি উদ্ধারকারী দল একসঙ্গে মাঠে নামলে তাদের সমন্বয় ও পরিচালনাও স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

তাই এবার বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যান না করে সাহায্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাইছে কাঠমান্ডু।

বিদেশি সাহায্য বন্ধ নয়, নিয়ন্ত্রণ কাঠমান্ডুর হাতে

নেপালের বর্তমান অবস্থানকে তাই সরাসরি বিদেশি সাহায্য প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং তাদের মতে, কাঠমান্ডু চাইছে উদ্ধার ও ত্রাণকাজের মূল নিয়ন্ত্রণ দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের হাতেই থাকুক।

একদিকে বিদেশি দেশগুলির কাছ থেকে অর্থ, ত্রাণ, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের উদ্ধার অভিযানে বিদেশি দলের উপস্থিতি সীমিত রাখা হচ্ছে।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা, বর্তমান দুর্যোগে প্রশাসনিক সমন্বয় বজায় রাখার প্রয়োজন এবং দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতার উপর আস্থা—এই কারণগুলিই নেপালের বর্তমান সিদ্ধান্তের পিছনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং নেপালের নিজস্ব উদ্ধার ও ত্রাণব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে এই ভয়াবহ দুর্যোগ সামাল দিতে পারে, সেদিকেই নজর রয়েছে।

Related Post